মানব শরীরে লবণের উপকারিতা ও অপকারিতা

খাবারের অতুলনীয় স্বাদ আনতে লবণ খুবই দরকারী। লবন মানব শরীরের জন্য কতটুকু দরকারী আর কতটুকু দরকারী না এটা আমরা জানা দরকার।

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। ছোটবেলায় কম বেশি আমরা সবাই  এই ” লবন ” এর গল্পটি শুনেছি।

“এক রাজার ৩ কন্যা।একবার রাজা তার কন্যাদের জিজ্ঞেস করলেন তার কোন কন্যা তাকে কিসের মত ভালোবাসে। প্রথম কন্যা বললো চিনির মত, দ্বিতীয় কন্যা বললো গুড়ের মত আর কনিষ্ঠ কন্যা বললো লবনের মত। প্রথম ২ কন্যার কথায় রাজা সন্তুষ্ট হলেন কিন্তু কনিষ্ঠ কন্যর কথায় রাজার রাগ হলো এবং তিমি ছোট মেয়েকে বনবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। একবার  শিকারে গেলে দেরি হয়ে যায় তখন বনের ভিতরে ছোট্ট কুটির দেখেন এবং তুনি জানতেন না সেটা আমি তার ছোট কন্যারই কুটির। তো নিজের পরিচয় না দিয়ে কন্যা তার কুটিরে অতিথি আপ্যায়নের সুযোগ দেয়ার কথা বলাতে রাজা রাজি হলেন। তো সে রাজাকে  প্রথমে শুধু চিনির তৈরি সবজি খেতে দিলেন।  রাজা খেতে পারলেন না, তারপর শুধু গুড়ের তৈরি সবজি খেতে দিলেন রাজা সেটিও খেতে পারলেন না। এবার লবন দিয়ে তৈরি সবজি দিলেন রাজা খেয়ে অনুভব করলেন যে লবন ছাড়া কোন সবজিই খাওয়া সম্ভব নয়।তখন তার ছোট কন্যা সামনে আসলেন ও বললেন তাই বাবা আমি আপনাকে লবনের মত ভালোবাসি বলেছিলাম সেদিন। রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং তার কন্যাকে নিয়ে রাজপ্রসাদে ফিরলেন।”

এই গল্পটি বলার কারন হলো, লবন ছাড়া কোন খাবারেই স্বাদ পাওয়া যায় না। মিষ্টি জাতীয় কাবারে অল্প বিস্তর লবন ব্যবহার করা যায়। আমাদের সমস্ত রকমের খাবারের স্বাদ অতুলনীয় রাখতে লবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লবন যেমন খাবারে স্বাদ আনে এবং মানব শরীরের জন্য যেমন উপকারী তেমনি অতিরিক্ত লবন খাওয়া আবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

কি পরিমান লবন শরীরের জন্য দরকার ও উপকারী এই বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি নির্দেশিকাও আছে। সম্প্রতি সময়ে গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণায় লবন খাওয়া নিয়ে নানা রকম সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, “লবণ অতিরিক্ত বা খুব কম খাওয়া ঠিক নয়। তবে প্রতিদিন দুই গ্রাম বা হাফ চা চামচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এছাড়া কাঁচা লবণ খাওয়া যাবে না।”

আমেরিকান হেলথ অ্যাসোসিয়েশন-এর গবেষকদের দাবি, “লবণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ফলে শরীরের পানি কমে যেতে পারে। ফলে ব্রেন স্ট্রোকের শঙ্কা বাড়ে। এছাড়া ক্ষয়ে যেতে থাকে হাড়ের ক্যালসিয়াম।”

★ লবন খাওয়ার গুণাগুন :

লবনের গুনাগুন সম্পর্কে বলার আগে লবন আমাদের শরীরের জন্য কেন দরকারী ও কি কি পুষ্টিগুণ রয়েছে সে সম্পর্কে আগে জানা দরকার।

লবণ স্নায়ু ও পেশীর কাজকে যথাযথ রাখতে ও শরীরে তরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। লবনে যে সকল পুষ্টিগুণ রয়েছে সেগুলো হলো :

সোডিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালশিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম, জল, কপার ইত্যাদি উপাদান। যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। 

লবনের উপকারিতা –

১/ যাদের ব্লাড প্রেসার লো সেটা হাই করতে লবন খুবই উপকারী। যাদের ব্লাড প্রেসার লো তারা তাদের খাবারের পাতে এক চিমটি লবন খেলে ভালো কাজ দেয়।

২/ মুখের ব্যাক্টিরিয়া দূর করতে লবন খুবই কার্যকর। প্রতিদিন নিয়ম করে লবন জল দিয়ে গার্গেল করলে মাড়ির ব্যথা, দাঁতের ব্যথা ও মুখের ক্ষতিকর ব্যাক্টিরিয়া দূর হয়।

৩/ লবন খাবার হজমে সহায়ক। কারন খাবার হজমে অ্যাসিড ক্লোরিন ও হাইড্রোজেন এই ২ টি উপাদান প্রয়োজন; আর এই ২ টি উপাদানই রয়েছে লবনে।

৪/ গলা ব্যথা ও শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে উঞ্চ গরম জলে লবন মিশিয়ে খেলে ও গার্গেল করলে উপকার পাওয়া যায়। 

৫/ সোডিয়াম আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী। সোডিয়ামের অভাব হলে শরীরে জলে অভাব হয় এবং স্নায়ুতন্ত্রও সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।  আর সোডিয়ামের অভাবে মানুষ ভুলভাল বকে।

৬/ অতিরিক্ত ঘামে শরীরে লবণের পরিমান কমতে থাকে এবং খিচুনি হবার সম্ভাবনা দেখা যায়। অ্যাথলিটদের, বয়স্কদের অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে খিচুনি হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। 

লবনের বহু গুণাবলি এবং অনেক উপকারিতা রয়েছে যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই দরকারী। এর মাঝেও লবনের কিছু অপকারিতাও আছে।

★ লবন খাওয়ার ক্ষতিকর দিক : 

লবন যেমন খাবারকে সুস্বাদু করে এবং শরীরের জন্য উপকারী তেমনি অতিরিক্ত লবন শরীরের নানা সমস্যার কারনও হতে পারে। নিম্নে লবনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হলো। যেমন – 

১/ উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে তাদের জন্য লবন খুবই মারাত্মক। তাই চিকিৎসকরা উচ্চ রক্তচাপ সম্পূর্ণ রোগীদের লবন কম খাওয়ার উপদেশ দিয়ে থাকেন।

২/ যাদের হার্টে সমস্যা তাদের অতিরিক্ত লবন খাওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।

৩/ বেশি লবন খাওয়া হাড়ের জন্যও ক্ষতিকর। অতিরিক্ত লবন হাড় থেকে  ক্যালসিয়াম কমিয়ে অস্টিওপোরেসিস নামক রোগের সৃষ্টি করতে পারে। তাই পরিমিত লবন খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

৪/ অতিরিক্ত লবন খাওয়ার ফলে স্ট্রোক ও হার্টের রোগ হবার প্রবনতা দেখা দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে স্ট্রোকের কারনে যাদের মৃত্যু হয় তার বেশির ভাগের কারনই হলো অতিরিক্ত লবন সেবন। 

৫/ অতিরিক্ত লবন সেবন কিডনি সনস্যার কারনও হতে পারে।অতিরিক্ত লবন খাওয়ার ফলে হৃদপিন্ডের চাপ বাড়তে পারে। এতে করে কিডনি থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম নিঃসৃত হিয় এবং কিডনিতে পাথরও সৃষ্টি হতে পারে।

৬/ অতিরিক্ত লবন খাওয়ার ফলে ব্লাড প্রেসার বাড়তে পারে। এতে করে ডায়বেটিসের মত রোগেরও সৃষ্টি হতে পারে। 

লবনের  ভালো ও খারাপ দুটি দিকই রয়েছে। তাই প্রয়োজন মত ও স্বাস্থ্যের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু লবন খাওয়াই স্বাস্থ্য সম্মত। তাই স্বাস্থ্য রক্ষায় লবন খাওয়ায় সচেতন হওয়া উচিত।