দাঁতের গর্তের জন্য করণীয়

দাঁতের গর্তের জন্য করণীয়

 

আমাদের অতি মূল্যবান সম্পদ দাঁত। বর্তমানে দাঁত ক্ষয় ও দাঁতে ছিদ্র হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত শিশু, টিনএজার ও বয়স্কদের এই সমস্যাটি বেশি হতে দেখা যায়। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলেই দাঁত ক্ষয় হয়ে থাকে।

ঘন ঘন স্ন্যাক্স ও ড্রিঙ্কস খাওয়া, অনেকক্ষণ যাবত দাঁতের মধ্যে খাবার লেগে থাকা, ফ্লোরাইড এর অপর্যাপ্ততা, মুখ ড্রাই থাকা, মুখের স্বাস্থ্যবিধি না মানা, পুষ্টির ঘাটতি এবং ক্ষুধামন্দার সমস্যা থাকা ইত্যাদি কারণে দাঁতে গর্ত ও দাঁত ক্ষয় হয়ে থাকে।

দাঁতের মধ্যে নানা কারণে গর্ত হতে পারে। যেমন দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ, দাঁত ভেঙে গিয়ে কিংবা রুট ক্যানেল চিকিৎসার জন্যও গর্ত হয়ে যায় দাঁত। দাঁতের মধ্যে গর্ত বা ক্যাভিটি হলে তাতে ময়লা, খাদ্যকণা ইত্যাদি জমে সংক্রমণ হয়। দাঁতে ব্যথা করে ও শিরশির অনুভূতি হয়। শিশুদের এই গর্ত বা ক্যাভিটি হলে তারা ব্যথায় কষ্ট পায় ও কিছু খেতে গেলেই দাঁত শিরশির করে ওঠে।

ডেন্টাল ক্যারিজ প্রাথমিক অবস্থায় খুবই ছোট কালো গর্তের মতো দেখায়। এই কালো গর্ত দাঁতে তৈরি হলেও ব্যথা অনুভূত হয় না। তাই শিশুরাতো বটেই, প্রাপ্তবয়স্করাও বুঝতে পারে না যে গর্ত তৈরি হচ্ছে। এই গর্তের মধ্যে জটিলতা তৈরি হওয়ার পরই কেবল ধরা পড়ে। এছাড়া দাঁত ভেঙে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী সেটা বুঝতে পারে।

রুট ক্যানেল চিকিৎসায় রোগী যদি পরসেলিন ক্রাউন বা মুকুট পরে না নেয়, তাহলেও দাঁতে গর্ত বেড়ে যায়। পরে রুট ক্যানেল এবং ভেতরের জিনিসপত্র সব বেরিয়ে আসে।

দাঁতে গর্তের চিকিৎসা: দাঁতের গর্তের লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্র দেরি না করে শূন্য জায়গাটা ভর্তি করে নেওয়া উচিত। কারণ, ডেন্টাল ক্যারিজ যদি ধীরে ধীরে ডেন্টিন থেকে আরও গভীরে অর্থাৎ পাল্প চেম্বার পর্যন্ত চলে যায়, তবে ব্যথার তীব্রতা বেড়ে যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থাও জটিল হয়ে পড়ে।

ভাঙা দাঁতকে আজকাল ফিলিং ম্যাটেরিয়াল বা লাইট কিউর দিয়ে সুন্দরভাবে পূরণ করা যায়, যা দেখতে অবিকল স্বাভাবিক রঙের হয়। রুট ক্যানেল চিকিৎসা করা দাঁতের ক্রাউন বা মুকুট বসাতে দেরি করা উচিত নয়।

ক্যাভিটি প্রতিরোধের ৫ উপায়: ১. সঠিক নিয়মে প্রতিদিন দুই বেলা দাঁত ব্রাশ করা উচিত। ২. চিনিযুক্ত পানীয় বা আঠালো খাবার, অম্লযুক্ত খাবার, কফি ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত। ৩. খাওয়ার পর কুলি করে মুখ ধুয়ে ফেলা দরকার। শুধু ব্রাশ নয়, সুতো বা ফ্লস দিয়ে দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করা উচিত। ৪. ধূমপান বর্জন করা দরকার। ৫. আর অবশ্যই ক্যাভিটি প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত দাঁত পরীক্ষা করা আবশ্যক।

যার দাঁত সুন্দর তার হাসিও সুন্দর। তাছাড়া এই দাঁতের সাহায্যেই আমরা প্রতিদিন খাবার খেয়ে থাকি। তাই সুন্দর এবং মজবুত দাঁতের জন্য চাই দাঁতের সঠিক যত্ন। দাঁতের যত্ন নিতে সঠিক স্বাস্থ্য অভ্যাস গড়ে তোলা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।এখন জেনে নেয়া যাক কিভাবে আমরা সঠিক নিয়মে দাঁতের যত্ন নিব –

০১.নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করাঃ

প্রতিদিন অন্তত ২ বার ভালো ভাবে দাঁত ব্রাশ করা এবং প্রতিবার দুই মিনিট করে সময় নেওয়া উচিত।এমন ভাবে ব্রাশ করতে হবে যেন ব্রাশ দাঁতের সব দিকে পৌঁছায় এবং জিহবাকেও যেন স্পর্শ করে। দাঁত ব্রাশ করার সময় প্রথম দুই মিনিট একটি শুষ্ক ব্রাশে শুধু পানি ব্যবহার করে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। দিনের বেলায় দাঁত ব্রাশ করার কারণে প্লাক উপজাত এবং বিষক্রিয়া জনিত মাথাব্যথার ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব।তাই দুপুরেও খাওয়ার পরও একবার দাঁত ব্রাশ করে নেওয়া উচিত। রাতে ঘুমানোর সময় আমাদের মুখ দিনের মতো লালা সুরক্ষা করে না।তাই রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে এক বার দাঁত ব্রাশ করা ভালো।

০২. দৈনিক দাঁতে Floss এবং জিহবার স্ক্র্যাপার ব্যবহার করাঃ

যে কোন খাবার খাওয়ার পর তা দাঁতের মধ্যে আঁটকে যায় (যেমনঃ মাংস, ভূট্টা, caramel, চিনাবাদাম, মাখন, ইত্যাদি)। তাই দৈনিক দাঁতে Floss ব্যবহার করা উচিত। Floss ব্যবহারের মাধ্যমে দাঁতের অন্য পাশকেও পরিষ্কার রাখা যায় যেখানে টুথব্রাশ পৌঁছোতে পারে না।

স্বাস্থ্যবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে জিহবার স্ক্র্যাপার।নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ এবং জিহবার প্লাক দূর করার জন্য এটি ব্যবহার করতে হবে।তাছাড়া টুথব্রাশ ব্যবহার করেও জিহবা পরিষ্কার করা যায়।

০৩. মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করাঃ

ফ্লোরাইড মাউথ ওয়াশ দাঁত জোরদার করতে সাহায্য করে।৬ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যে শিশুদের মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা শেখানো ভালো।তবে ব্যবহারের আগে বোতলের সাথে থাকা নির্দেশনা দেখে নিতে হবে।

০৪. বিজ্ঞতার সঙ্গে খাবার বেঁছে খেতে হবেঃ

snack জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। কারন ক্রমাগত snacking দাঁতে প্লাক তৈরি করতে পারে, যা ধীরে ধীরে cavities বা ছোট ছোট ছিদ্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।চিনিযুক্ত এবং স্টিকি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। চিনি আমাদের মুখের ভেতর ব্যাকটেরিয়া জমায়, যা দাঁতের ভাঙ্গন সৃষ্টি করে।তাই এ জাতীয় খাবার খাওয়ার পর সাথে সাথে প্রচুর পানি বা পানীয় পান করা উচিত। ফলের রসে প্রচুর এসিড ও প্রাকৃতিক চিনি থাকে। তাই ন্যূনতম ফলের রস পান করতে হবে।শুধুমাত্র খাবার-সময়ে অথবা যখন প্রচুর খাবার খাওয়া হয় তখন ফলের রস পান করা যেতে পারে।বীজ জাতীয় খাবার এবং শক্ত হাড় কম চিবোনোর চেষ্টা করতে হবে। কারণ এটি দাঁতের molars এর মধ্যে ফাঁটল তৈরি করতে পারে।

০৫. ডেন্টিস্ট এর কাছে যেতে হবেঃ

অন্তত প্রতি ছয় মাস পর পর ডেন্টিস্ট এর কাছে যাওয়া উচিত এবং দাঁতের কোন সমস্যা হলে সাথে সাথে ডেন্টিস্টকে জানানো উচিত। বছরে একবার একজন পেশাদারী রেজিস্টার্ড ডেন্টাল hygienist এর কাছ থেকে দাঁত পরিস্কার করা উচিত।সবসময় খেয়াল রাখতে কোন cavities বা মাড়ির রোগের লক্ষণ দেখা যায় কিনা।ব্রাশ এবং floss ব্যবহার করার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে দাঁতের ডাক্তার এবং দাঁতের hygienist এর কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে।

টিপসঃ

• টুথব্রাশ প্রতি তিন মাস পর পর বদলানো উচিত।

• প্রতিদিন দুধ পান করার চেষ্টা করতে হবে, এটি ক্যালসিয়াম বাড়াতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে।

• টুথব্রাশ এমন হতে হবে যেন সহজেই তা gumline এর দিকে বাঁকানো যায়।একটি ছোট বৃত্তাকার গতিতে দাঁতের ভেতরে,বাইরে,উপরে এবং GUM লাইনের নিচে ব্রাশ করতে হবে। কোমল পানীয় পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং চিনিযুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে।

• খুব শক্ত ব্রাশ মাড়িতে আঘাত করে রক্ত ঝড়াতে পারে আর খুব নরম ব্রাশ প্লাক দূর করতে পারে না। তাই মাঝারি ধরনের ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে।

• প্রথমে টুথব্রাশ কে দাঁতের ডান পাশের উপর রাখতে হবে।এরপর ব্রাশ নিচে এবং উপরের দিকে সরিয়ে প্রতিটি দাঁত ব্রাশ করতে হবে। এই পদ্ধতি প্রতিটি দাঁতের জন্য বেশ কয়েকবার করে করতে হবে।

• দাঁত ব্রাশ করার পরে মুখে মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে।

ব্যাকটেরিয়া আমাদের একটা অংশ, এটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।প্রত্যেকের মুখেই লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, যার কোন উদ্দেশ্য নেই।এটি দাঁতের পৃষ্ঠের চারপাশে নিজেদের স্থান করে নেয় এবং আমাদের দাঁতে “প্লাক” সৃষ্টি করে অদৃশ্য ভাবে আমাদের দাঁত ক্ষয় করতে থাকে। এটা খুব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং দ্রুত ঘটে। তাই অবহেলা না করে সঠিক ভাবে দাঁতের যত্ন নিতে হবে।

 

আরো দেখুন—

 

দাঁতের গর্তের জন্য করণীয় দাঁতের গর্তের জন্য করণীয়